Category Archives: আসহাবে রাসূলের জীবনকথা

খালিদ বিন ওয়ালিদের সাথে কথা বলে ঈমান আনলেন রোমান সেনাপতি

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যক্তিত্ব রোমান বাহিনীকে কতটুকু প্রভাবিত করেছিল বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে তা অনুধাবন করা যায়। ইয়ারমূকের যুদ্ধ তখন চলছে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে রোমান বাহিনীর এক কমান্ডার, নাম ‘জারজাহ’ নিজ ছাউনী থেকে বেরিয়ে এল। তার উদ্দেশ্য খালিদের সাথে সরাসরি কথা বলা। খালিদ তাকে সময় ও সুযোগ দিলেন।

জারজাহ বললো : “খালিদ আমাকে একটি সত্যি কথা বলুন, মিথ্যা বলবেন না। স্বাধীন ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি মিথ্যা বলেন না। আল্লাহ কি আকাশ থেকে আপনাদের নবীকে এমন কোন তরবারি দান করেছেন যা তিনি আপনাকে দিয়েছেন এবং সেই তরবারি যাদের বিরুদ্ধেই উত্তোলিত হয়েছে, তারা পরাজিত হয়েছে?
খালিদ : না।
জারজাহ : তাহলে আপনাকে ‘সাইফুল্লাহ’ — আল্লাহর তরবারি বলা হয় কেন?
খালিদ : আল্লাহ আমাদের মাঝে তার রাসূল পাঠালেন। আমদের কেউ তাকে বিশ্বাস করলো, কেউ করলো না। প্রথমে আমি ছিলাম শেষোক্ত দলে। অতঃপর আল্লাহ আমার অন্তর ঘুরিয়ে দেন। আমি তাঁর রসূলের ওপর ঈমান এনে তার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করি। রসূল (সা) আমার জন্য দু’আ করেন। আমাকে তিনি বলেনঃ তুমি আল্লাহর একটি তরবারি। এভাবে আমি হলাম ‘সাইফুল্লাহ’। বিস্তারিত পড়ুন

আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) : একজন বিনয়ী মানুষের কথা

আব্দুল্লাহ ইবন উমার। পিতা উমার ইবনুল খাত্তাব, মাতা যয়নাব। সঠিক বর্ণনা মতে হিজরী তৃতীয় সনে উহুদ যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। এই হিসাবে নবুয়াতের দ্বিতীয় বছরে তার জন্ম। নবুয়াতের ষষ্ঠ বছরে হযরত উমার যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন আব্দুল্লাহর বয়স প্রায় পাঁচ।

হযরত ইবন উমার (রা) মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হতে পারে এমন সব কাজ থেকে সব সময় বিরত থাকতেন। তিনি ছিলেন সত্যভাষী। তবে মাঝে মাঝে মুসলিম উম্মাহর ক্ষতির সম্ভাবনা দেখলে চুপ থাকতেন। একবার হযরত আমীর মুয়াবিয়া (রা) দাবী করলেন খিলাফত লাভের অধিকার আমার থেকে বেশী আর কার আছে? ইবন উমার একথার জবাব দিতে গিয়েও ফিতনা-ফাসাদের ভয়ে দেননি। তিনি চুপ থাকেন।

এমনিভাবে মিনায় খলীফা উসমানের পেছনে চার রাকায়াত নামায আদায় করেন। অথচ তিনি মনে করতেন রাসূলুল্লাহ (সা), আবু বকর ও উমারের সুন্নাত অনুযায়ী সেখানে কসর হওয়া উচিত। আবার একাকী পড়লে দু’রাকায়াতই পড়লেন। বিভেদ সৃষ্টির আশংকায় উসমানের পেছনে চার রাকায়াত পড়েছিলেন। বিস্তারিত পড়ুন

আসমা বিনতু আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহা

হযরত আসমা বিনতু আবু বকর সর্বদিক দিয়েই সম্মান ও মর্যাদার অধিকারিণী ছিলেন। তার পিতা, পিতামহ, ভগ্নি, স্বামী ও পুত্র সকলেই ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবী। উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন তার সহোদরা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশেষ সাহায্যকারী (হাওয়ারী) যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা) তার স্বামী এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে শহীদ হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যুবাইর তার পুত্র। হিজরাতের ২৭ বছর পূর্বে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

প্রথম যুগেই যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন আসমা (রা) তাদেরই একজন। মাত্র সতেরজন নারী পুরুষ ব্যতীত আর কেউ তার আগে এ সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেনি। তাকে জাতুন নিতাকাইন — দু’টি কোমর বন্ধনীর অধিকারিণী বলা হয়। কারণ, মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাতের সময় তিনি রাসূল (সা) ও তার পিতার জন্য থলিতে পাথেয় ও মশকে পানি গুছিয়ে দিচ্ছিলেন। কিন্তু তার মুখ বাঁধার জন্য ধারে কাছে কোন রশি খুঁজে পেলেন না। অবশেষে নিজের কোমরের নিতাক বা বন্ধনী খুলে দু’টুকরো করে একটি দ্বারা থলি ও অন্যটি দ্বারা মশকের মুখ বেঁধে দেন, এ দেখে রাসূল (সা) তার জন্য দুআ করেনঃ আল্লাহ যেন এর বিনিময়ে জান্নাতে তাকে দু’টি ‘নিতাক’ দান করেন। এভাবে তিনি ‘জাতুন নিতাকাইন’ উপাধি লাভ করেন।
বিস্তারিত পড়ুন

মুসয়াব ইবন উমাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু


পিতা-মাতার পরম আদরে ঐশ্বর্যের মধ্যে লালিত মক্কার অন্যতম সুদর্শন যুবক ছিলেন তিনি। মা সম্পদশালী হওয়ার কারণে অত্যন্ত ভোগ-বিলাসের মধ্যে তাঁকে প্রতিপালন করেন। তখনকার যুগে মক্কার যত রকমের চমৎকার পোষাক ও উৎকৃষ্ট খুশবু পাওয়া যেত সবই তিনি ব্যবহার করতেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সামনে কোনভাবে তার প্রসঙ্গ উঠলে বলতেনঃ “মক্কায় মুসআবের চেয়ে সুদর্শন এবং উৎকৃষ্ট পোষাকধারী আর কেউ ছিল না।” (তাবাকাত) ঐতিহাসিকেরা বলেছেনঃ “তিনি ছিলেন মক্কার সর্বোৎকৃষ্ট সুগন্ধি ব্যবহারকারি।”
বিস্তারিত পড়ুন

সালমান আল ফারেসি (রা) : তাকওয়ার বাস্তব নমুনা যিনি

হযরত সালমান আল ফারেসি রাদিয়াল্লাহু আনহু সেই সব বিশিষ্ট সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত যাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশেষ নৈকট্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ রাসূল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেদিন রাতে সালমানের সাথে নিভৃতে আলোচনা করতে বসতেন, আমরা তাঁর স্ত্রীরা ধারণা করতাম সালমান হয়তো আজ আমাদের রাতের সান্নিধ্যটুকু কেড়ে নেবে।

যুহদ ও তাকওয়ায় তিনি ছিলেন বাস্তব নমুনা। ক্ষণিকের মুসাফির হিসেবে তিনি জীবন যাপন করেছেন। জীবনে কোন বাড়ি তৈরি করেননি। কোথাও কোন প্রাচীর বা গাছের ছায়া পেলে সেখানেই শুয়ে যেতেন। এক ব্যক্তি তাঁর কাছে ইজাজত চাইলো, তাকে একটি ঘর বানিয়ে দেওয়ার। তিনি নিষেধ করলেন। বারবার পীড়াপীড়িতে শেষে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "কেমন ঘর বানাবে?"। লোকটি বললো, "এত ছোট যে, দাঁড়ালে মাথায় চাল বেঁধে যাবে এবং শুয়ে পড়লে দেয়ালে পা ঠেকে যাবে। এ কথায় তিনি রাজী হলেন। তার জন্য একটি ঝুপড়ি ঘর তৈরি করা হয়। হযরত হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ "সালমান যখন পাঁচ হাজার দিরহাম ভাতা পেতেন, তিরিশ হাজার লোকের উপর প্রভুত্ব করতেন কখনো তার একটি মাত্র আবা ছিলো। তার মধ্যে ভরে তিনি কাঠ সংগ্রহ করতেন। ঘুমানোর সময় আবাটির একপাশ গায়ে দিতেন এবং অন্য পাশ বিছাতেন।

হযরত সালমান (রা) যখন রোগশয্যায়, হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) তাকে দেখতে যান। সালমান (রা) কাঁদতে শুরু করলেন। সা’দ বললেনঃ "আবু আবদিল্লাহ, আপনি কাঁদছেন কেন? রাসূল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো আপনার প্রতি সন্তষ্ট অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। হাউজে কাওসারের নিকট তাঁর সাথে আপনি মিলিত হবেন। "

বললেন, "আমি মরণ ভয়ে কাঁদছিনে। কান্নার কারণ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, আমাদের সাজ-সরঞ্জাম যেন একজন মুসাফিরের সাজ-সরঞ্জাম থেকে বেশি না হয়। অথচ আমার কাছে এতগুলি জিনিসপত্র জমা হয়ে গেছে।"

সা’দ বলেনঃ সেই জিনিসগুলি একটি বড় পিয়ালা, তামার একটি থালা ও একটি পানির পাত্র ছাড়া আর কিছু নয়।

//

** উপরিউক্ত জীবনী অংশটুকু আসহাবে রাসূলের জীবনকথা (প্রথম পর্ব) থেকে হুবহু উদ্ধৃত হয়েছে।

আবু যার আল গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহু

হযরত আবু যার থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা মোট আটাশ। তন্মধ্যে বারোটি হাদিস মুত্তাফাক আলাইহি অর্থাৎ বুখারী ও মুসলিম উভয়ে বর্ণনা করেছেন। দু’টি বুখারী এবং সাতটি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদের তুলনায় তার বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা এত কম হওয়ার কারণ তিনি সবসময় চুপচাপ থাকতেন, নির্জনতা পছন্দ করতেন। এ কারণে তার জ্ঞানের তেমন প্রচার হয়নি। অথচ হযরত আনাস ইবন মালিক, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস প্রমুখের ন্যায় বিদ্বান সাহাবীগণ তার নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। ইবন আসাকির তার “তারীখে দিমাশক” গ্রন্ধে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

হযরত উসমানের খিলাফাতকালে আবু যার একবার হজ্জে গেলেন। এক ব্যক্তি এসে বললো, উসমান মিনায় অবস্থানকালে চার রাকাআন নামায আদায় করেছেন (অর্থাৎ কসর করেননি), বিষয়টি তার মনঃপুত হলো না। অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নিন্দা করে বললেন, “রাসূলুল্লাহ (সা), আবু বকর ও উমারের পেছনে আমি নামায আদায় করেছি। তারা সকলেই দু’রাকাআত পড়েছেন। একথা বলার পর তিনি নিজেই ইমামতি করলেন এবং চার রাকাআতই আদায় করলেন। লোকেরা বললো। “আপনিতো আমীরুল মু’মিনীনের সমালোচনা করলেন আর এখন নিজেই চার রাকাআত আদায় করলেন।”
তিনি বললেন, “মতভেদ খুবই খারাপ বিষয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,’আমার পরে যারা আমীর হবে তাদের অপমান করবেনা। যে ব্যক্তি তাদের অপমান করার ইচ্ছা করবে সে ইসলামের সুদৃঢ় রজ্জু স্বীয় কাঁধ থেকে ছুঁড়ে ফেলবে এবং নিজের জন্য তাওবার দরজা বন্ধ করে দেবে।” (মুসনাদের আহমাদ, ৫/১৬৫)

একদিন এক ব্যক্তি আবু যার আল গিফারী (রা) এর নিকট এলো। সে তার ঘরের চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখলো। গৃহস্থালীর কোন সামগ্রী দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করলো,

— আবু যার, আপনার সামান-পত্র কোথায়?

— আখিরাতে আমার একটি বাড়ি আছে। আমার সব উৎকৃষ্ট সামগ্রী সেখানেই পাঠিয়ে দিই।

একদা সিরিয়ার আমীর তার নিকট তিনশ দিনার পাঠালেন। আর বলে পাঠালেন, এ দ্বারা আপনি আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করুন। “শামের আমীর কি আমার থেকে অধিকতর নীচ কোন আল্লাহর বান্দাকে পেলোনা?” — একথা বলে তিনি দিনারগুলি ফেরত পাঠালেন।

// আসহাবে রাসূলের জীবনকথা (প্রথম খন্ড) থেকে গৃহীত //

তালহা বিন উবাইদুল্লাহ (রা) — একজন বিত্তশালী ব্যবসায়ীর কথা

হযরত তালহা বিন উবাইদুল্লাহ (রা) ছিলেন একজন বিত্তশালী ব্যবসায়ী। কিন্তু সম্পদ পুঞ্জীভূত করার লালসা তার ছিলোনা। তার দানশীলতার বহু কাহিনী ইতিহাসে পাওয়া যায়। ইতিহাসে তাকে “দানশীল তালহা” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একবার হাদরামাউত থেকে সত্তর হাজার দিরহাম এলো তার হাতে। রাতে তিনি বিমর্ষ এবং উৎকন্ঠিত হয়ে পড়লেন। তার স্ত্রী হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কন্যা উম্মু কুলসুম স্বামীর এ অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করলেনঃ

— আবু মুহাম্মাদ, আপনার কী হয়েছে? মনে হয় আমার কোন আচরণে আপনি কষ্ট পেয়েছেন।

— না, একজন মুসলমান পুরুষের স্ত্রী হিসেবে তুমি বড় চমতকার। কিন্তু সেই সন্ধ্যা থেকে আমি চিন্তা করছি, এত অর্থ ঘরে রেখে ঘুমালে একজন মানুষের তার পরওয়ারদিগারের প্রতি কীরূপ ধারণা হবে?

— এতে আপনার বিষণ্ণ ও চিন্তিত হওয়ার কী আছে? এত রাতে গরীব-দুখী ও আপনার আত্মীয় পরিজনদের কোথায় পাবেন? সকাল হলেই বন্টন করে দেবেন।

— আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন। একেই বলে, বাপ কি বেটী।

পরদিন সকালবেলা ভিন্ন ভিন্ন থলি ও পাত্রে সকল দিরহাম ভাগ করে মুহাজির ও আনসারদের গরীব মিসকীনদের মধ্যে তিনি বন্টন করে দেন।
তার দানশীলতা সম্পর্কে অপর একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এক ব্যক্তি হযরত তালহার নিকট এসে তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে কিছু সাহায্য চাইলো। তালহা বললেনঃ অমুক স্থানে আমার একখন্ড জমি আছে। উসমান ইবনে আফফান উক্ত জমির বিনিময়ে আমাকে তিন লাখ দিরহাম দিতে চান। তুমি ইচ্ছে করলে সেই জমিটুকু নিতে পারো বা আমি তা বিক্রি করে তিন লাখ দিরহাম তোমাকে দিতে পারি। লোকটি মূল্যই নিতে চাইলো। তিনি তাকে বিক্রয়লব্ধ সমুদয় অর্থ দান করেন।

// ** উপরিউক্ত অংশটুকু আসহাবে রাসূলের জীবনকথা (প্রথম খন্ড) থেকে হুবহু উদ্ধৃত ** //