ইমাম আন-নওয়াবী (রহ) এর সংকলিত চল্লিশ হাদীস – দুই : ভাগ্য, ইসলাম, ইমান, ইহসান ও জ্ঞানীদের দৃষ্টান্ত [১]

লেখাটি নেয়া হয়েছে দ্বীন উইকলি থেকে । প্রথম পর্ব এখানে পড়ুন

এপর্বে জানবেনঃ
* হাদীসের সরল বাংলা অনুবাদ,
* হাদীসের ব্যাকগ্রাউন্ড,
* শিক্ষা,
* প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক জ্ঞানার্জনের পদ্ধতি,
* ক্বদর বা ভাগ্য,
* ভাগ্য সম্পর্কে ভুল ধারনাগুলো,

(হাদিসটি আরবিতে পড়তে ছবির উপরে ক্লিক করুন)

হাদীসের সরল বাংলা অনুবাদ

আমীরুল মু’মিনীন আবু হাফস্ উমার বিন আল-খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলন, একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বসেছিলাম, এমন সময় হঠাৎ এক ব্যক্তি আমাদের সামনে উপস্থিত হয় যার কাপড় ছিল ধবধবে সাদা, চুল ছিল ভীষণ কালো; তার মাঝে ভ্রমণের কোন লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। আমাদের মধ্যে কেউ তাকে চিনতে পারে নাই। সে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে গিয়ে বসে, নিজের হাঁটু তার হাঁটুর সঙ্গে মিলিয়ে নিজের হাত তার উরুতে রেখে বললেনঃ “হে মুহাম্মাদ, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন”।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “ইসলাম হচ্ছে এই- তুমি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন সত্য ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল, সালাত প্রতিষ্ঠা কর, যাকাত আদায় কর, রমাদানে সওম সাধনা কর এবং যদি সামর্থ থাকে তবে (আল্লাহর) ঘরের হজ্জ কর।

তিনি (লোকটি) বললেনঃ “আপনি ঠিক বলেছেন”। আমরা বিস্মিত হলাম, সে নিজে তার নিকট জিজ্ঞাসা করেছে আবার নিজেই তার জবাবকে ঠিক বলে ঘোষণা করছে। এরপর বললঃ “আচ্ছা, আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন”।

তিনি (রাসূল) বললেনঃ “তা হচ্ছে এই- আল্লাহ্, তাঁর ফিরিশ্তাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ ও আখেরাত বিশ্বাস করা এবং ভাগ্যের ভাল-মন্দকে বিশ্বাস করা।

সে (আগুন্তুক) বললঃ “আপনি ঠিক বলেছেন”। তারপর বললঃ “আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন”

তিনি বলেনঃ “তা হচ্ছে এই- তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত কর যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ, আর তুমি যদি তাঁকে দেখতে নাও পাও তবে তিনি তোমাকে দেখছেন”।

সে বললঃ “আমাকে কেয়ামত সম্পর্কে বলুন”।

তিনি (রাসূল) বললেনঃ “যাকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে সে জিজ্ঞাসাকারী অপেক্ষা বেশী কিছু জানে না”।

সে (আগন্তুক) বললঃ “আচ্ছা, তার লক্ষণ সম্পর্কে বলুন”। তিনি (রাসূল) বললেনঃ “তা হচ্ছে এই- দাসী নিজের মালিককে জন্ম দেবে, সম্পদ ও বস্ত্রহীন রাখালগণ উঁচু উঁচু প্রাসাদে দম্ভ করবে”।

তারপর ঐ ব্যক্তি চলে যায়, আর আমি আরো কিছুক্ষণ বসে থাকি। তখন তিনি (রাসূল) আমাকে বললেনঃ “হে উমার, প্রশ্নকারী কে ছিলেন, তুমি কি জান? আমি বললামঃ “আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল অধিক ভাল জানেন”। তিনি বললেনঃ “তিনি হলেন জিবরীল। তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে তোমাদের কাছে এসেছিলেন।” [সহীহ্ মুসলিমঃ ৮]

হাদীসের ব্যাকগ্রাউন্ড

ইমাম মুসলিম বলেছেন, হযরত উমর (রা) এর ছেলের শেষ বয়সের দিকে দুইজন ব্যাক্তি তাঁকে জানালো যে ইরাকে একটি নতুন ইসলামিক মতাদর্শের আবির্ভাব হয়েছে। এই মতাদর্শের নাম হল আল-ক্বাদারিয়াহ যারা ক্বদর তথা ভাগ্যে বিশ্বাস করতে অস্বিকার করেছে। তখন তাদের এই কথাকে খন্ডন করার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে উমর হাদীসটি এই বর্ননা করেন যেখানে ক্বদরে তথা ভাগ্যে বিশ্বাসকে ইমানের অন্যতম একটি পিলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষাঃ

এই হাদীসটির মাধ্যমে আমরা জ্ঞান অর্জনের আদব শিক্ষা পাই। এই হাদীস অনুসারে দেখা যায় জ্ঞান অর্জনের সময় আমাদের নিম্নোল্যেখিত দিক গুলোর প্রতি খেয়াল রাখা দরকার।

  1. জ্ঞানার্জনের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং পরিষ্কার কাপড় পরিধান করা
  2. শিক্ষক ও ছাত্র পরস্পরে কাছা কাছি বসা
  3. উত্তম ভাবে বুঝার জন্য প্রশ্ন করা
  4. সঠিক উৎস থেকে জ্ঞান অর্জন করা

প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক জ্ঞানার্জনের পদ্ধতি

  • অর্থপুর্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা যা মুল্যবান জ্ঞান ও ভালো কাজের দিকে আমাদেরকে ধাবিত করে
  • ভালো প্রশ্ন উত্তম শিক্ষা ও প্রশিক্ষনকে নিশ্চিত করে, অনেকের উপস্থিতিতে যখন কেউ প্রশ্ন করে এবং সেই প্রশ্নের যখন উত্তর করা হয় তখন দুইটি ব্যপার ঘটে। একটি হল শংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোনের উন্মোচন হয় এবং তা স্রোতাদের জ্ঞানের পরিধিকে বিস্তৃত করে অন্যদিকে যখন প্রশ্নটির উত্তর দেয়া হয় তখন যারা জানে না তাদের জানা হয়ে যায় এবং উত্তর দাতার প্রদত্ত উত্তর থেকে আরও নতুন নতুন জ্ঞান লাভ করা যায়। এভাবে প্রশ্নকারী এবং উত্তরকারী উভয় থেকেই জ্ঞান অর্জিত হয়।
  • সাহাবাদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্কলার ইবনে আব্বাসকে (রা) যখন প্রশ্ন করা হল যে কিভাবে তিনি তার জ্ঞান গুলো অর্জন করেছিলেন, জবাবে তিনি বললেন “ অনুসন্ধিৎসু বা কৌতুহলী জিহ্বা দ্বারা আর চিন্তাশীল মন দ্বারা”
  • রাসুল (স) এর অসংখ্য হাদীসে রাসুল (স) নিজেই কোন কিছু জানানোর আগে প্রশ্ন করার মাধ্যমে শুরু করতেন। প্রশ্নকরাটা স্রোতার মনকে আসন্ন জ্ঞান কে গ্রহন করতে তৈরী করে এবং মনোযোগ আকর্ষন করে।
  • বিভিন্ন উদ্দেশ্যে এবং পাঠকের মনে ও চিন্তার জগতে সাড়া জাগাতে শুধুমাত্র কুরআনেই বিভিন্ন বিষয়ে ১২০০ এরও বেশী প্রশ্ন আছে।

ক্বদর বা ভাগ্য

উলামাদের মতে ক্বদর বা ভাগ্য দুইটি স্তরে বিভক্ত হতে পারে।

  1. আমরা বিশ্বাস করি যে আল্লাহ তার সার্বজনীন জ্ঞানের মাধ্যমে জানেন যে তার সৃষ্টির সবাই ভবিষ্যতে কী কী করবে, তিনি এটা জানেন এই সৃষ্টির আবির্ভাবের আগে থেকেই। আল্লাহ লাওহে মাহফুজে সকল প্রকার জ্ঞানকে রেকর্ড করে রেখেছেন।
  2. আমরা বিশ্বাস করি যে ভালো আর খারাপ যাই ঘটুক তা আল্লাহর ইচ্ছায়ই ঘটবে।

আল্লাহ আমাদের ইচ্ছা এবং কোন কিছু করার শক্তি দুটোকেই সৃষ্টি করেছেন। আমরা একমাত্র সে কাজগুলোই করতে পারি যেগুলো আমরা করতে ইচ্ছুক এবং যে কাজগুলো আমরা করার ক্ষমতা রাখি। কিন্তু ভালো বা খারাপ কাজের মধ্যে যেকোন একটা বেছে নেয়ার স্বাধীনতাও আল্লাহ আমাদেরকে দিয়েছেন। সাথে সাথে কোন কাজটা ভালো এবং কোন কাজটা খারাপ তা বুঝার শক্তিও আল্লাহ আমাদেরকে দিয়েছেন, শুধু তাই নয় সৃষ্টিগত ভাবেই আমাদেরকে ভালো খারাপের পার্থক্য করার স্বাভাবিক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, এবং আরও জটিল ক্ষেত্রে ভালো ও খারাপকে আলাদা করে চেনার জন্য সেই ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে দেয়ার লক্ষ্যে আল্লাহ জ্ঞান নাযিল করেছেন। তাই প্রতিটি কাজের জন্য আমাদেরকেই দায় বহন করতে হবে।

ভাগ্য সম্পর্কে ভুল ধারনাগুলো

অনেক মুসলমান মনে করেন যে তারা ভালো খারাপ যা ই করছেন এবং যা ই করতে যাচ্ছেন তার কারন হল এটা তাদের ভাগ্যে লিখে রাখা হয়ছে। যেহেতু তাদের ভাগ্যে এটা লিখে রাখা হয়েছে সেহেতু এটার জন্য তারা দায়ী হতে পারেন না। যদি এটা তাদের ভাগ্যে লিখে রাখা না হতো তাহলে তো তারা এ কাজটা করতেনই না। তারা মুলত ব্যপারটা “কারন” এবং “অংশিদারত্বের” মাঝে গুলিয়ে ফেলেন। সত্যটা হল এখানে কাজ করার ক্ষেত্রে “কারন”টা মুলত প্রধান বা মুখ্য নয় বরং কাজের মধ্যে আমাদের “অংশিদারত্ব”ই মুখ্য। আমরা যা করি তার জন্য আল্লাহ কতৃক আমাদের ভাগ্যে লিখে রাখাটা দায়ী নয় বরং আমাদের সংশ্লিষ্ট কাজে জড়িয়ে পড়াটাই (অংশিদারত্ব) দায়ী। যদি এমন হতো যে আমাদের সামনে কাজটা করা ও না করার দুইটি অপশন না থাকতো, কিংবা এমন যদি হতো যে, কোন মুল্যেই আমাদের সামনে কাজটি এড়াবার সুযোগ না থাকতো তাহলে ভাগ্যের লিখনকে দোষারোপ করা যেতো। অর্থাৎ যখন কোন কারনে কিছু ঘটে তখন ঐ ঘটনা ঘটাবার বা না ঘটাবার উপর ঘটকের কোন নিয়ন্ত্রন থাকে না, এখানে ঘটক নিজেও ঘটনার একটা আহার্য মাত্র। কিন্তু যখন মানুষ নিযে যেচে বা অংশিদারিত্ব নিয়ে কোন কাজে লিপ্ত হয় তখন সেখানে ঐ কাজে অংশগ্রহন করা বা না করার যেকোন একটা সিধ্যান্ত নেয়ার সুযোগ তার থাকে, এই ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে কিছু কারনের উপস্থিতি থাকলেও কর্তা চাইলেই সেগুলো এড়িয়ে চলতে পারে। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত শংশ্লিষ্ট কাজ করা বা না করার সিধ্যান্তটা কর্তার হাতেই থাকে, এখন যেকোন পাপ কাজ ও অপরাধমুলক কাজের কথা চিন্তা করুন দেখবেন সেখানে মানুষের ইচ্ছাটাই বেশী কাজ করে এবং মানুষ চাইলে যেকোন মুল্যে এসব কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে। অর্থাৎ খারাপ কাজ করা বা না করার চুড়ান্ত সিধ্যান্তিটা আমাদেরই হাতে, সিধ্যান্ত গ্রহনে আমরা স্বাধীন তাই এর দায়টাও আমরা এড়াতে পারি না। এখানেই কর্তার ভালো ও খারাপের যে কোন একটা বেছে নেয়ার স্বাধিনতাটার প্রয়োগ হয়। একারনেই কাজের জন্য তাকেই দায়ী হতে হয়। এখানে সুরা আর রাদ এর একটি আয়াত উল্লেখ না করলেই নয় সেটা হল إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ অর্থাৎ “নিশ্চই আল্লাহ ততোক্ষন পর্যন্ত কারও অবস্থা বদলান না যতোক্ষন না তারা তাদের নিজেদেরকে না বদলায়” এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি ব্যাক্তির বা জাতির উপরই তার কর্মফল নির্ভর করে এবং ক্বদর নির্ধারিত হলেও ব্যাক্তির চেষ্টাটাই সব শেষে আল্লাহ বিবেচনা করেন।

আগামী পর্বে পাবেন

– ভাগ্য সম্পর্কে ভুল ধারনাগুলো (বাকী অংশ)
– ইসলাম, ইমান ও ইহসান
– জ্ঞানীদের চরিত্র এবং আদব

**** এই হাদীসটির ব্যাখ্যা আগামী পর্বে সমাপ্যঃ আমাদের সাথেই থাকুন, লেখাটি আপনার ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে দাওয়াতে দ্বীনের কাজে আমাদের সাথে আপনিও শরিক হোন।

বি:দ্রঃ লেখাটির ভাবানুবাদ ও থিম নেয়া হয়েছে যার লেখা থেকে:
Dr. Jamal Ahmed Badi
Associate Professor
Department of General Studies
International Islamic University Malaysia

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s