ইমাম আন-নওয়াবী (রহ) এর সংকলিত চল্লিশ হাদীস :: এক – ইখলাস ও নিয়ত

লেখাটি সংগ্রহ করা হয়েছে দ্বীন উইকলি থেকে

এই পর্বে জানবেন…

  • হাদীসের সরল বাংলা অর্থ
  • হাদীসের ব্যাকগ্রাউন্ড
  • হাদীসের শিক্ষা
  • ইখলাস অর্জনের অন্তরায়
  • ইখলাস (sincerity) কিভাবে অর্জন করবো
  • এই হাদীসের হুকুম গুলো

আমীরুল মু’মিনীন আবু হাফস্ উমার বিন আল-খাত্তাব (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন- আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি- সমস্ত কাজের ফলাফল নির্ভর করে নিয়্যতের উপর, আর প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়্যত করেছে, তাই পাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের জন্য হিজরত করেছে, তার হিজরত আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে হয়েছে, আর যার হিজরত দুনিয়া (পার্থিব বস্তু) আহরণ করার জন্য অথবা মহিলাকে বিয়ে করার জন্য তার হিজরত সে জন্য বিবেচিত হবে যে জন্য সে হিজরত করেছে [সহীহ্ আল-বুখারীঃ ১, সহীহ্ মুসলিমঃ ১৯০৭।

হাদীসের ব্যাকগ্রাউন্ড

এই হাদীসটি রাসুল (স) বলেছেন এমন এক পরিপ্রেক্ষিতে যখন একজন ব্যাক্তি (পুরুষ) হিজরতের সময় কোন এক জনকে (মহিলা) বিয়ে করার উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছেন। অন্যসবাই যখন আল্লাহ ও তার রাসুলের (স) আদেশ কে মান্য করে ইসলামের জন্য হিজরত করেছেন তখন শংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির উদ্দেশ্য ছিলো তার পছন্দের নারীকে বিয়ে করা। এই হাদীসটি ইসলামে গুরুত্বপুর্ন হাদীসগুলোর অন্যতম।

এই হাদীসটির ব্যপারে ইমাম শাফেয়ী (রহ) বলেন, এই হাদীসটি সমস্ত ইসলামি জ্ঞানের একতৃতীয়াংশ যা ফিকহের সত্তুরটি বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত। ইমাম আহমদ (রহ) ইমাম শাফেয়ী (রহ) এর মতামতকে ভিত্তিকরে বলেন ইসলামর তিনটি মৌলিক ভিতের মধ্যে একটি হল এই হাদীসটি। বাদবাকী দুইটি মৌলিক ভিতের আলোচনা আগামী পর্বের হাদীস গুলোতে আসবে।

“নিয়্যাহ” শব্দটির দুইটি অর্থ হয় যেমন

১। কোন ইবাদাতের পুর্বে মনস্থির করা

২। ইচ্ছা করা

এই হাদীস দ্বারা ২য় অর্থটাকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। এই দুটি অর্থের মধ্যে একটি মেজর পার্থক্য হল যখন কেউ কোন ভালো কিছু করার জন্য মনস্থির করেন তখন আল্লাহ তাঁকে একটি ভালো কাজ করার জন্য মনস্থির করার বদৌলতে যাযাহ দান করেন। কিন্তু যখন কেউ কোন নির্দিষ্ট (দুনিয়াবী) উদ্দেশ্য পুর্ন করার জন্য কোন ভালো কাজ করেন তখন সেটার জন্য তার ঐ দুনিয়াবী উদ্দেশ্যই শুধু পুর্ন হয় কিন্তু আখিরাতে নিয়ে যাবার জন্য আমল নামায় কিছু যোগ হয় না।

শিক্ষাঃ

রাসুল (স) হাদীসটি শুরু করেছেন “ইন্নামাল আ’মালু বিন্নিয়্যাত” অর্থাৎ সমস্ত কাজের ফলাফল নির্ভর করে নিয়্যতের উপর এই কথা বলে। এর পরেই তিনি তিনটি উদাহরন দিয়েছেন, এটাই রাসুল (স) এর পদ্ধতি। এই উদাহরন গুলো আমাদেরকে মুল বক্তব্যটাকে ব্যাক্ষা করতে সাহায্য করে। যার কারনে আমরা একই ধরনের পরিস্থিতিতে হাদীসের শিক্ষাটাকে বাস্তবায়ন করতে পারি। তবে মুলত এই হাদীসে নিয়তের দুইটি দিককেই স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। যে তিনটি উদাহরন এখানে আমরা দেখতে পাই সেগুলো হল “ভালো এবং নিষ্কলুষ নিয়তে হিজরত”, “দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে হাসিলের নিয়তে হিজরত” এবং “বিয়ের নিয়তে হিজরত”। উল্যেক্ষ্য এখানে “বিয়ের নিয়তে হিজরতটা” মুলত দুনিয়াবী উদ্দেশ্য অর্জনেরই একটি অংশ। কিন্তু যেহেতু মুল ঘটনাটা বিয়ের উদ্দেশ্য প্রনোদিত হিজরতকে নিয়ে সেহেতু রাসুল (স) এখানে শুধু বিয়ের উদ্দেশ্যে হিযরতের কথা বলেই খ্যান্ত হতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা না করে মানুষের এই উদ্দেশ্য প্রনোদিত ভালোকাজের যে ঝোঁক সেটাকে আরও বৃহৎ পরিসর থেকে বুঝাবার জন্য “দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে হাসিলের নিয়তে হিজরত” এর কথা আলাদা করে উল্ল্যেখ করেছেন। মুলত এই কথাটার মধ্যদিয়ে যাবতীয় মতলবাচ্ছন্ন দ্বীমুখি নীতিকে একসাথে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এই হাদিসটি মুলত খুলুসিয়্যাত বা ইখলাসের (sincerity) উপর গুরুত্বারোপ করেছে। ইখলাস বলতে আমরা আল্লাহর প্রতি আমাদের সততা এবং ন্যায়গত অবস্থানকেই বুঝি, যেখানে যেকোন কাজের পেছনে একমাত্র এবং শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তারই জন্য করাকে বুঝায়। যে কোন ভালো কাজ বা ইবাতাদ কবুলের জন্য ইখলাস একটি গুরুত্বপুর্ন শর্ত। এর পরেই আসে শরিয়ত সম্মত পদ্ধতির কথা। অর্থাৎ কোন ইবাদত পালনের পদ্ধতি যদি সম্পুর্ন শরিয়ত সম্মত হয় কিন্তু নিয়তে অন্য দুনিয়াবী কোন উদ্দেশ্য থাকে তাহলে সে ইবাদতের দ্বারা ঐ দুনিয়াবী উদ্দেশ্যই শুধু হাসিল হবে কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি কিংবা পুন্য বা সওয়াব হিসেবে আমলনামায় কিছু যোগ হওয়ার সুযোগ থাকবে না।

বাস্তবিক অভিজ্ঞতা থেকে যদি দেখতে হয় তাহলে বলা যায়, কেউ যদি নিজ উস্তাদের/বাবা-মার বেতের আঘাত বা বকা-ঝকা থেকে বাঁচার জন্য নামাজে দাঁড়ায় এবং সে যদি নামাজে সঠিক ভাবে সুরা ও তাসবীহগুলো একবারও উচ্চারন না করে তাহলেও সে অবশ্যই উস্তাদের বেতের আঘাত বা বাবা-মার বকা-ঝকা থেকে বেঁচে যাবে। কিন্তু আল্লাহর কাছে নামাজ কবুল হবে না। এদিকে কেউ নির্দিষ্ট কোন দলের পদবী বাগিয়ে নেয়ার জন্য যদি কোন ভালো কাজ করে, বা নিয়মিত নামাজ পড়ে তাহলে সে হয়তো তার উদ্দেশ্যকে অর্জন করতে পারবে কিন্তু আল্লাহর জন্য তার কিছুই করা হবে না। আর এখানেই ইখলাস তথা এই হাদীসটির মোক্ষম প্রয়োগের সময়।

ইখলাস অর্জনের অন্তরায়

ইমাম আল হারাওয়ী (রহ) বলেন, ইখলাস অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হল আত্ম-চাহিদা। সুতরাং নিজের ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে কোন কাজই করা ঠিক নয়। এদিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যায়, যে ব্যাক্তি যখন ভালো মনে করে তখন নামাজ পড়ে কিন্তু যখন মনে টানে না তখন নামাজ পড়ে না, সে ব্যাক্তির জন্য কিন্তু নামাজ পড়া এবং নামাজ না পড়া এই দুটোই আত্ম-চাহিদা মেটানোর নিমিত্তে হচ্ছে। যার কারনে তার নামাজ না পড়াটা যেমন তার আত্ম-চাহিদাকে তুষ্ট করছে তেমনি তার নামাজ পড়াটাও তার আত্ম চাহিদাকেই তুষ্ট করছে। অতএব দেখা গেলো আমাদের যখিন ইচ্ছা ইবাদাত করা এবং যখন ইচ্ছা ইবাদাত না করার মধ্য দিয়ে আল্লাহর সাথে ইখলাসের সম্পর্ক রচিত হচ্ছে না। সেজন্য ইমাম আল হারাওয়ী (রহ) এর মতে আমাদেরকে সাত ধরনের আত্ম-চাহিদা মোহিত করে রাখে।

১। অন্যের কাছে নিজেকে ভালো বলে উপস্থাপন করার প্রবনতা- প্রদর্শনেচ্ছা

২। অন্যের প্রশংসা কুড়ানোর প্রবনতা

৩। অন্যের চোখে দোষি হতে না চাওয়া

৪। অন্যের দ্বারা মাহাত্ব পাওয়ার প্রবনতা

৫। অন্যের ধন-দৌলত ও টাকার প্রতি লোভ

৬। অন্যের ভালোবাসা বা সেবা পাওয়ার লোভ

৭। নিজের জন্য অন্যের সাহায্য পাওয়ার আকাংখ্যা

এখন আমরা কিভাবে ইখলাস (sincerity) অর্জন করবো

  • ভালো কাজ করাঃ আমরা যতো ভালো কাজ করবো ততোই আলাহর কাছাকাছি হতে পারবো এবং ততোই ইখলাস অর্জিত হবে।
  • কোন কিছু করার আগে সে বিষয়ে জ্ঞান প্ররজন করা এবং পরিপুর্ন শরিয়তের অনুসরনের মাধ্যমে কাজটি সম্পাদন করা।
  • কোন মিছে অভিনয় না করা, অন্যের কাছে সিনসিয়ার হওয়ার ইচ্ছা দূরে রাখা
  • ইমাম আহমদ (রহ) বলেনঃ কোন কিছু করার আগে নিজের নিয়তকে চাযাই করে নাও, নিজেকে প্রশ্ন করো “এটাকি আল্লাহর জন্যই করছো?”

ইবনুল কাইয়্যিম বলেনঃ আমরা যাকিছু করি তার সবই তিনটি ভুলের মুখাপেক্ষী

  • অন্যেরা আমাদের কাজক পর্যবেক্ষন করছে এমন মনে করা
  • কাজের রেজাল্ট আশাকরা
  • নিজের কাজের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা
    • উদাহরন স্বরুপঃ যদি আমরা নামাজের জন্য মসজিদে আগে আগে গিয়ে দেখি যে আমরা ইমামের আগে এসেছি এবং প্রথম সারিতে যায়গা পেয়েছি তখন আমাদের গর্বিত বা সন্তুষ্ট হওয়া উচিৎ নয়, এবং নিজদেরকে অন্যদের চেয়ে উত্তম ভাবা উচিৎ নয়। আমাদের বরং উচিৎ কোন বাধা-বিপত্তি ছাড়াই আমাদেরকে এই সুযোগ দানের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
    • সকল নামাজের পরে, আমাদের নিজেদেরকে একথা বলা উচিৎ যে আমরা নামাজটা আরও ভালো ও সুন্দর করে আদায় করতে পারতাম এবং পরবর্তি নামাজ আরও ভালো করে আদায় করার চেষ্টা করা।

এখন যদি আমরা কোন কাজের মধ্যবর্তি অবস্থায় নিয়ত পরিবর্তন করে ফেলি তাহলে কি হবে? অর্থাৎ ভালো নিয়তে কোন কাজ শুরু করার পর মাঝপথে এসে কোন কারনে নিয়ত পরিবর্তন হয়ে গেলো তখন কি হবে? ইবনে রাজাব (রহ) বলেন, উলামাদের মতে কাজের শেষের নিয়ত যদি শুরুর নিয়তের সাথে মিলে যায় তাহলে মাঝপথের এই পরিবর্তন ক্ষমাকরে দেয়া হবে অথবা এটা কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু যদি কাজের শুরুর ভালো নিয়তের সাথে শেষের নিয়ত যদি না মেলে তাহলে আমাদেরকে তওবা করতে হবে।

চারটি জিনিস ইখলাসের সাথে বৈপরিত্য রাখে

১। মা’সিয়াতঃ- গুনাহ করা- এটা আমাদের ইখলাসকে দুর্বল করে দেয়
২। শিরক করা
৩। রিয়াঃ- লোকদেখানো বা প্রদর্শনেচ্ছা, শো-অফনেস
৪। নিফাকঃ মূণাফেকি

যদিও আমাদেরকে সবসময় নিশ্চিত করতে হবে যে আমাদের কাজ ও ইবাদাত কখনও ইখলাস থেকে বিচ্যুত না হয় তথাপিও কিছু কিছু কাজ আছে যেগুলো অটোমেটিক্যালি ভালো নিয়তের বলে ধরে নেয়া হয় যেমনঃ ইসলামের জ্ঞান অর্জন করা, সমাজকে সাহায্য করা, দাওয়াত দেয়া ইত্যাদি।

এই হাদীসের হুকুম গুলো

  • যখন কেউ যখন তখন ওয়াল্লাহি বলে আল্লাহর কসম করে, তাদের নিয়ত প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর কসম করা নয় বরং এটা হল তাদের অভ্যাসের বশে বলা কথা। এটা তাদের মুখ থেকে অনায়াসেই বেরিয়ে আসে, সুতরাং এটি ক্ষতিকারক নয়। তবে একজন মুসলমানের উচিৎ তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা যাতে সে এটা বলা কমাতে পারে।
  • যখন কাউকে শপথ করতে বলা হয়, তখন তার নিয়তকেই বিচার করা হয় যখন সে শপথ করে
  • কাজের মধ্যে ইবাদাত এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়ার এই দুইটি নিয়তই একসাথে হতে পারে। যেমন আমরা আল্লাহর জন্য ইবাদাত করতে পারি পাশাপাশি ইবাদতটা অন্যকে শেখানোর জন্যও করতে পারি। উদাহরন স্বরুপঃ রাসুল (স) যখন হজ্জ্ব করলেন তখন তিনি যেমন হজ্জ্ব আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে করেছিলেন তেমনি সাহাবাদেরকে শেখানোর উদ্দেশ্যে তাঁর ছিলো।
  • একজন ব্যাক্তি মুখে অথবা কোর্টের মাধ্যমে তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে তবে এক্ষেত্রে তার নিয়তটাই ধর্তব্য
  • গীবতের ক্ষেত্রেও নিয়তটাই বিবেচ্য হবে যে সে কি আসলে কৌতুক করেছে নাকি দুয়া করেছে।

যার লেখা থেকে ভাবধারা ও অনুবাদ করা হলো

Dr. Jamal Ahmed Badi
Associate Professor
Department of General Studies
International Islamic University Malaysia

Advertisements

One response to “ইমাম আন-নওয়াবী (রহ) এর সংকলিত চল্লিশ হাদীস :: এক – ইখলাস ও নিয়ত

  1. পিংব্যাকঃ ইমাম আন-নওয়াবী (রহ) এর সংকলিত চল্লিশ হাদীস – দুই : ভাগ্য, ইসলাম, ইমান, ইহসান ও জ্ঞানীদের দৃষ্টান্ত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s